টেলিগ্রামে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বিনিয়োগ গ্রুপ পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় আরও দুইজনকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
পল্টন থানার মামলা নং-১০, তারিখ-০৪/০৯/২০২৫ খ্রি., ধারা-৪২০/৪০৬/১০৯/৩৪ পেনাল কোড-এর তদন্তের ধারাবাহিকতায় সিআইডির ঢাকা মেট্রো পূর্ব বিভাগের একটি আভিযানিক দল গত ২৬/০১/২০২৬ খ্রি. রাত আনুমানিক ২০.৩০ ঘটিকার সময় ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ থানা এলাকা থেকে আসামী রনজিত বসাক রওনক (২৫), পিতা-ভজন বসাক এবং ২৭/০১/২০২৬ খ্রি. রাত আনুমানিক ০২.০০ ঘটিকার সময় দিনাজপুর সদর থানাধীন সুইহারী এলাকা থেকে আসামী পলাশ চন্দ্র বসাক (৪০), পিতা-রবিদাস বসাক, মাতা-লিলা রানী বসাক-কে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত উভয় আসামীর স্থায়ী ঠিকানা: উভয় সাং-১৫২ রানিশৈংকল, থানা- রানিশৈংকল, জেলা-ঠাকুরগাঁও।
উল্লেখ্য, মামলার পূর্বে গ্রেফতারকৃত মূলহোতা ফারদিন আহমেদ ওরফে প্রতীক (২৫) এবং সহযোগী মো. সাগর আহমেদ (২৪) বিজ্ঞ আদালতে ফৌ.কা.বি. ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানকালে উক্ত দুই আসামীর নাম প্রকাশ করে। তাদের প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতেই রনজিত ও পলাশকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, প্রতারক চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে টেলিগ্রাম অ্যাপে ‘বিদেশি বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম’ ও অন্যান্য বিভিন্ন আকর্ষণীয় নামে ভুয়া গ্রুপ খুলে অল্প সময়ে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগে প্ররোচিত করত। ভিকটিমরা গ্রুপে যুক্ত হলে সেখানে আগে থেকেই যুক্ত কিছু সদস্য বিনিয়োগ করে কীভাবে স্বল্প সময়ে অধিক লাভ করেছে—এমন ভুয়া ও সাজানো পোস্ট দিত। প্রকৃতপক্ষে এসব সদস্যই ছিল চক্রের সক্রিয় সহযোগী এবং পোস্টগুলো ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।
এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রলুব্ধ হয়ে গ্রুপের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) একাউন্টে অর্থ প্রেরণ করত। এসব একাউন্ট অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তৃতীয় ব্যক্তির নামে খোলা ছিল, যাদের অনেকেই প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পরবর্তীতে প্রতারকরা এসব একাউন্ট ব্যবহার করে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেন ও আত্মসাৎ করত। বহু বিনিয়োগকারী এভাবে সর্বস্ব হারিয়েছে। তদন্তে আরও জানা যায়, প্রতারণার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ নগদে রূপান্তরের জন্য চক্রটি অভিনব কৌশল ব্যবহার করত। মূলহোতা ফারদিন আহমেদ বিভিন্ন গাড়ির শোরুম থেকে ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে গাড়ি ক্রয় করে স্বল্প সময়ের মধ্যে কম দামে বিক্রি করে কাগজে লোকসান দেখিয়ে নগদ অর্থ উত্তোলন করত। এই পদ্ধতিতেই অবৈধ অর্থ ‘ক্যাশ আউট’ করা হতো।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আসামী রনজিত বসাক রওনক অবৈধ টেলিগ্রাম গ্রুপের একজন সদস্য ছিল এবং গ্রুপের প্রধান পরিচালকের নির্দেশনায় আর্থিক লেনদেনের কার্যক্রমে যুক্ত ছিল। অপরদিকে, আসামী পলাশ চন্দ্র বসাক টেলিগ্রাম গ্রুপের মূলহোতা ‘মিশন’-এর ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। সে কমিশনভিত্তিকভাবে কাজ করত, যার ন্যূনতম দৈনিক পারিশ্রমিক ছিল ১,৫০০ টাকা। গ্রুপের মাধ্যমে লেনদেন ও বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি হলে সে অতিরিক্ত কমিশন পেত, যা কোনো কোনো সময় দৈনিক ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতো। সে নিজের নামে নিবন্ধিত একাধিক সিমকার্ড উক্ত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করত এবং মূলহোতার সকল অবৈধ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত ছিল।
গ্রেফতারকৃত উভয় আসামীকে প্রয়োজনীয় পুলিশ প্রহরায় বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং ১০ (দশ) দিনের পুলিশ হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করা হয়েছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম সিআইডির ঢাকা মেট্রো পূর্ব বিভাগ কর্তৃক চলমান রয়েছে এবং প্রতারণা চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।
