ইরান ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে রাজধানী ঢাকায় জ্বালানি তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে তেলের তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে—এমন গুজব ও আতঙ্কে রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংগ্রহের হিড়িক পড়েছে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) দিনগত রাত থেকে শুরু হওয়া এই উপচে পড়া ভিড় শনিবার আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানীর শাহবাগ, কারওয়ানবাজার, মতিঝিল ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকার পাম্পগুলোতে তেলের জন্য গাড়ি ও মোটরসাইকেলের কিলোমিটারব্যাপী দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পের মালিক ও কর্মচারীরা।
শনিবার সকালে ও বিকালে রাজধানীর শাহবাগ ও পরিবাগ এলাকার পাম্পগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকশ মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির সারি। লাইনের শেষ প্রান্ত গিয়ে ঠেকেছে সায়েন্সল্যাব মোড় পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে কাওরান বাজার, বাসাবো-মুগদা ও মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায়। সেখানে সরকারি-বেসরকারি অফিসগামী যানবাহনের চাপে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক পাম্পে তেল নেই কিংবা সরবরাহ সীমিত লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাসাবো ও খিলগাঁও এলাকার পাম্পগুলোতে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ বোতল ও কন্টেইনার নিয়ে তেল সংগ্রহের জন্য ভিড় করছেন, যা নিয়ে পাম্প কর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা লেগেই আছে।
পাম্প মালিকদের বক্তব্য- চাহিদা অস্বাভাবিক
হঠাৎ এই ভিড় সামাল দিতে নাজেহাল পাম্প মালিকরা। শাহবাগ-পরিবাগ এলাকার মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার আহমেদ রূশদ যুগান্তরকে বলেন, গতকালের চেয়ে আজকে ভিড় চারগুণ বেশি। আমাদের ট্যাংকে যে পরিমাণ তেল ছিল, তা সাধারণ সময়ে তিনদিন চলত। কিন্তু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে সবাই ফুল ট্যাংক করছে, কেউ কেউ অতিরিক্ত কন্টেইনারেও নিতে চাচ্ছে। ডিপো থেকে নিয়মিত সরবরাহ না এলে আমাদের পাম্প বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকবে না। তবে আশা করছি, আগামীকাল (রোববার) থেকে ডিপো তেল সরবরাহ করবে। তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আজ থেকে আমরা সরকার নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহ করছি।
তালিকায় দেখা যায়, মোটর সাইকেলের জন্য অকটেন বা পেট্রল সর্বোচ্চ ২ লিটার, প্রাইভেটকারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লিটার এবং এসইউভি/জিপ/মাইক্রোবাসের জন্য সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ লিটার জ্বালানি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বাসাবো-মুগদা এলাকার শান্ত সিএনজি ও অয়েল পাম্পের ম্যানেজার খান ইকবাল যুগান্তরকে জানান, তেলের মজুত থাকলেও জনবল সংকটের কারণে এত বিশাল ভিড় সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
গ্রাহকদের হাহাকার: ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত
তেল নিতে আসা সাধারণ মানুষের চোখেমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ। শাহবাগ মোড়ে মোটরসাইকেলে তেলের জন্য অপেক্ষমাণ বেসরকারি চাকরিজীবী রাকিবুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, টেলিভিশনে দেখছি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যদি তেলের জাহাজ আসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তো চলাই কঠিন হবে। তাই ২ ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। গতকাল (শুক্রবার) দিবাগত রাতে ৩টি পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি, আজ এখানে দাঁড়িয়েছি।
বাসাবো এলাকায় লাইনে থাকা এক মাইক্রোবাস চালক জুলহাস আক্ষেপ করে যুগান্তরকে বলেন, আগে ৫০০ টাকার তেল নিতাম, আজকে ৫০০০ টাকার তেল নিচ্ছি। যদি দাম বেড়ে যায় বা তেল না পাওয়া যায়, সেই ভয়েই এই কষ্ট করছি।
বিপিসি ও মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং আগামী ৬ মাসের জন্য সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। যুদ্ধের প্রভাবে এখনই সংকট হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। জনসাধারণকে গুজবে কান না দিয়ে স্বাভাবিকভাবে তেল সংগ্রহের অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।
সূত্র যুগান্তর।
