করাপশন টক
বৃহস্পতিবার, ২রা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

৩৩ বছর পর সংসদে ফিরে এলো মুলতবি প্রস্তাব

editor
এপ্রিল ২, ২০২৬ ১২:১৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জাতীয় সংসদে দীর্ঘদিন পর ফিরে এসেছে একটি প্রায় বিস্মৃত সংসদীয় প্রক্রিয়া—‘মুলতবি প্রস্তাব’। তিন দশকের বেশি সময় পর এই প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক নতুন করে রাজনৈতিক ও সংসদীয় অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে।

সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ডা শফিকুর রহমানের উত্থাপিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-সংক্রান্ত প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য গ্রহণ করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। সেই সূত্র ধরে ৩১ মার্চ মঙ্গলবার বহুদিন পর জাতীয় সংসদ দেখে এক জমজমাট বিতর্ক, যা স্বাভাবিক কার্যসূচি স্থগিত রেখে অগ্রাধিকার পেয়েছে।

মুলতবি প্রস্তাব কী

মুলতবি প্রস্তাব হলো এমন একটি সংসদীয় প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জরুরি ও জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন কোনো বিষয় নিয়ে সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে চলমান সব কার্যক্রম স্থগিত রেখে নির্দিষ্ট বিষয়েই আলোচনা হয়।

একজন সংসদ সদস্য অধিবেশন শুরুর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে নোটিশ দেন। এরপর স্পিকার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানান—প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হবে কি না।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

মুলতবি প্রস্তাবকে সংসদের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ধরা হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় ধরে আলোচনা হয় এবং প্রয়োজনে ভোটাভুটিও হতে পারে। প্রস্তাব গৃহীত হলে সরকার রাজনৈতিকভাবে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে।

তবে ভোটাভুটি না হলেও এর প্রভাব থাকে। খোলামেলা বিতর্ক সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে এবং জনমতকে সক্রিয় করে তোলে।

কী ঘটে এই আলোচনায়?

মুলতবি প্রস্তাবের মূল শক্তি তার ‘জরুরি’ চরিত্রে। সাধারণত দুই ঘণ্টা ধরে আলোচনা হয়, প্রয়োজনে ভোটাভুটিও হতে পারে। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে রাজনৈতিকভাবে বাধ্যবাধকতার মুখে পড়তে হয়।

তবে ভোটাভুটি না হলেও এর প্রভাব কম নয়। সংসদে এমন খোলামেলা বিতর্ক অনেক সময় সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে, জনমতকে সক্রিয় করে তোলে। ফলে এটি একধরনের সংসদীয় ‘চাপ প্রয়োগের’ বৈধ পদ্ধতি হিসেবেও কাজ ক

এই প্রস্তাব আনার ক্ষেত্রে কিছু কঠোর শর্ত রয়েছে:

• বিষয়টি সাম্প্রতিক হতে হবে

• জাতীয় জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে হবে

• আদালত বা তদন্তাধীন বিষয় হওয়া যাবে না

• আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য বিষয় হলে তা এই প্রস্তাবের আওতায় পড়ে না

অর্থাৎ, এটি সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং জরুরি মনোযোগ দাবি করে এমন ইস্যুর জন্যই ব্যবহৃত হয়।

ইতিহাসে মুলতবি প্রস্তাব

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে মুলতবি প্রস্তাব খুব ঘন ঘন দেখা যায় না। ১৯৭৩ সালের পর থেকে ১২টি সংসদে মোট ৩৫টি প্রস্তাব আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছিল দ্বিতীয় সংসদে।

১৯৯০ এর দশকের শুরুতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা যেমন সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংসদে আলোচিত হয়েছিল এই প্রস্তাবের মাধ্যমে । এরপর দীর্ঘ বিরতি।

১৯৯১ সালের ২৩ এপ্রিল এনডিপি (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি) সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর তোলা মুলতবি প্রস্তাব সংসদে আলোচনার জন্য গৃহীত হয়। এর বিষয়বস্ত ছিল ‘মেহেরপুরে বিএসএফ-এর গুলিতে বিডিআর জওয়ানসহ চার বাংলাদেশি নিহত’ হওয়ার ঘটনা। প্রস্তাবটি সংসদে গৃহীত হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। ১৯৯২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ‘পাকিস্তানী নাগরিক’ গোলাম আযমের জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রধান হওয়া নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব করেন পতিত আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য শামসুল হক (ময়মনসিংহ)। একই বছর ২৮ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনেন ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেনন (বাকেরগঞ্জ)। প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং তা সংসদে আলোচিত হয়। ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়ে আলোচিত হয়। প্রস্তাবটি আনেন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম (যশোর-২)। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্র শিবিরের হাতে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর নেতা জোবায়ের চৌধুরী রিমু হত্যা। এরপর থেকে জাতীয় সংসদে কোনো মূলতুবি প্রস্তাব আলোচিত হয়নি।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ কমপক্ষে ২১ জনের প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে সংসদে মুলতবি আলোচনার জন্য নোটিশ দেন পতিত আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য। কিন্তু তা গৃহীত হয়নি। স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার না গ্রহন করার কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ওই বিষয়ে তখন চলমান বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা। ফলে বিষয়টি শুধু সংসদীয় নয়, রাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

এবার কেন ফিরে এলো

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবের ফিরে আসা নিছক নিয়মতান্ত্রিক ঘটনা নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে জুলাই আন্দোলন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে জনমত – সবকিছু মিলিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতার ইঙ্গিতও এতে দেখা গেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী প্রস্তাবটি বিরোধীদলীয় নেতা নিখুঁতভাবে আনেন নি। তবু সেটি আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। এটিই ইঙ্গিত দেয়, রাজনৈতিক বিবেচনা কখনও কখনও প্রক্রিয়াগত কড়াকড়িকে ছাড়িয়ে যায়। উদারতার সংকেত, না কৌশল?

সমালোচকরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ। আবার অনেকের মতে, দীর্ঘদিন পর এমন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সংসদীয় উদারতারই প্রকাশ।

আসলে সত্যটা মাঝামাঝিই। মুলতবি প্রস্তাব যেমন সরকারের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে, তেমনি এটি গণতান্ত্রিক আলোচনার ক্ষেত্রও বিস্তৃত করে।

মুলতবি প্রস্তাব মানেই সরকারের বিরুদ্ধে তিরস্কার, এমন সরল সমীকরণ সবসময় ঠিক নয়। বরং এটি সংসদকে কার্যকর, প্রাণবন্ত এবং জবাবদিহিমূলক করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

৩৩ বছর পর যে প্রক্রিয়াটি আবার আলোচনায় এলো, সেটি ভবিষ্যতে নিয়মিত ব্যবহৃত হবে কি না—সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠেছে। তবে এতটুকু স্পষ্ট, ‘মুলতবি প্রস্তাব’ সংসদীয় চর্চাকে নতুন করে প্রাণবন্ত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।