মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যাটো দেশগুলোর সহযোগিতার অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই সংকীর্ণ পানিপথটি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের ২০ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়।
সোমবার (১৫ মার্চ) তিনি ঘোষণা করেন যে, ‘অনেক দেশ আমাকে বলেছে তারা সহায়তার জন্য এগিয়ে আসছে,’ যদিও তিনি জনসমক্ষে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি।
তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ এ বিষয়ে বেশ উৎসাহী, আবার এমন কিছু দেশ আছে যাদের আমরা বহু বছর ধরে সাহায্য করেছি, ভয়াবহ বাইরের শত্রু থেকে রক্ষা করেছি, অথচ তারা ততটা উৎসাহ দেখায়নি। আর এই উৎসাহের মাত্রাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই প্রণালিতে তেলের ট্যাঙ্কার পাহারা দেওয়া বা যেকোনো ধরনের অভিযানে অংশ নেওয়া হবে একটি ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক মিশন’।
বিশেষ করে ইউরোপীয় নেতারা এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তারা এমন কোনো ঝুঁকি নিতে চান না যা তাদের ইরানের সঙ্গে চলমান এই বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে— বিশেষ করে যেহেতু তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি আক্রমণকে অবৈধ এবং প্রাথমিকভাবেই জাতিসংঘের ম্যান্ডেট বহির্ভূত হিসেবে বিবেচনা করেন।
জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য সেইসব দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম যারা ইতোমধ্যে এই যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকার করেছে।
ট্রাম্প বিশেষভাবে যুক্তরাজ্যের ওপর তার ‘বিস্ময়’ ও ‘অসন্তোষ’ প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সিংহভাগ অর্থায়ন করে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাতেও প্রধান অর্থদাতা হিসেবে কাজ করছে, তাই ব্রাসেলস (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) ওয়াশিংটনের কাছে ঋণী।
ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা [রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির] পুতিনকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। পুতিন আমাদের ভয় পান। ইউরোপকে নিয়ে তার বিন্দুমাত্র ভয় নেই।’
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা—একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি আলোচনা করেছেন, তবে তিনি তাদের ওপর খুব বেশি ‘চাপ সৃষ্টি করেননি’।
এর পরপরই নিজের আগের বক্তব্য থেকে কিছুটা সরে এসে ট্রাম্প বলেন, ‘কারণ আমার মনোভাব হলো—আমাদের কাউকে প্রয়োজন নেই।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা বিশ্বের শক্তিশালী দেশ। আমাদের সামরিক বাহিনী সবদিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী। আমাদের তাদের প্রয়োজন নেই। তবে বিষয়টি বেশ কৌতূহলজনক। আমি কিছু ক্ষেত্রে এটি (সহযোগিতা চাওয়া) করছি এই জন্য নয় যে আমাদের তাদের দরকার, বরং আমি দেখতে চাই তারা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়। কারণ, আমি বছরের পর বছর ধরে বলে আসছি যে—যদি কখনো আমাদের তাদের প্রয়োজন পড়ে, তবে তাদের পাওয়া যাবে না।’
‘এটি তাদের এলাকা’
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহ পার হতে না হতেই ইরান কার্যকরভাবে এই সামুদ্রিক পথটি বন্ধ করে দিয়েছে; শুধু বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজকে সেখানে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিচালিত তেল বাণিজ্যের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই সম্পন্ন হয়, যার বার্ষিক মূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশও এই পথে পরিবহণ করা হয়।
বিশ্বজুড়ে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এবং এর ফলে পেট্রোল পাম্পগুলোতে বিরূপ প্রভাব পড়ায়, ট্রাম্প গত কয়েক দিন ধরে বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে আসছেন।
তবে যেকোনো দেশের এমন পদক্ষেপকে ইরানিরা নিঃসন্দেহে উস্কানি হিসেবে গণ্য করবে।
গত রোববার ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বিমানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি দাবি করছি যে এই দেশগুলো এগিয়ে আসুক এবং তাদের নিজস্ব এলাকা রক্ষা করুক—কারণ এটি তাদেরই এলাকা।’
তিনি আরও বলেন, তাদের আসা উচিত এবং এটি রক্ষায় আমাদের সাহায্য করা উচিত। আপনারা এমন যুক্তিও দেখাতে পারেন যে আমাদের হয়তো সেখানে থাকারই দরকার নেই, কারণ আমাদের তেলের প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রচুর তেল আছে। আমরা বিশ্বের এক নম্বর তেল উৎপাদনকারী দেশ, যা অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ।
‘নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিন’
ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে হওয়া একটি কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করেন এবং মার্কিন প্রচেষ্টায় সহায়তা করবেন কিনা তা নিয়ে উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য তার কঠোর সমালোচনা করেন।
‘আমি বলেছিলাম, আপনার কোনো টিমের সঙ্গে বসার দরকার নেই। আপনি প্রধানমন্ত্রী, আপনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারেন। আমাদের সাহায্য করার জন্য মাইনসুইপার (মাইন অপসারণকারী জাহাজ) পাঠাবেন কিনা বা এগিয়ে আসবেন কিনা, তা ঠিক করতে কেন আপনাকে টিমের সঙ্গে বসতে হবে?’
হোয়াইট হাউসের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা বব ম্যাকনালি রোববার সিবিএস নিউজের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার কোনো নীতিগত সমাধান নেই।’
তিনি আরও যোগ করেন, এর প্রতিকারের উপায়গুলো সামান্য বা প্রতীকী থেকে শুরু করে গভীর অবিবেচনাপ্রসূত পর্যন্ত হতে পারে।
উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার শিকার হচ্ছে, কারণ সেখানে প্রচুর পরিমাণে মার্কিন সম্পদ ও ঘাঁটি রয়েছে। এই দেশগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসব্যাপী যুদ্ধের পরিকল্পনার অভাব ও অপ্রস্তুত অবস্থার দিকে আঙুল তুলেছে।
সোমবার (১৬ মার্চ) ট্রাম্প বলেন, তিনি আগেই অনুমান করেছিলেন ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে, যদিও তিনি একইসঙ্গে দাবি করেন যে ইরানের নৌবাহিনী বিধ্বস্ত এবং অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি জানতাম এই প্রণালিকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।’
তবে এই পরিস্থিতি প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে কেন তিনি ব্যর্থ হলেন, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। বিশেষ করে যখন আমেরিকানরা জ্বালানির আকাশচুম্বী দামের চাপে পিষ্ট হচ্ছে, যার প্রভাব সম্ভবত নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যালট বক্সে পড়বে।
একই সঙ্গে, ট্রাম্প সম্ভবত আঁচ করতে পারেননি যে তার উপসাগরীয় অংশীদারদের ওপর কতটা আগ্রাসীভাবে হামলা চালানো হবে। তিনি বলেন, [ইরান] কাতার, সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন ও কুয়েতে আঘাত করেছে। কেউ এটা আশা করেনি। আমরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম।
এখন পর্যন্ত কুয়েতের ভূখণ্ডে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে—৬ মার্কিন সৈন্য, ৪ কুয়েতি সৈন্য এবং ১ ইরানি শিশুসহ মোট ১১ জন নিহত হয়েছেন।
সোমবার (১৬ মার্চ) ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানিরা আমেরিকানদের সঙ্গে কথা বলছে এবং তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়। তবে ইরান এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে যেকোনো ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে এবং বলেছে যে নির্দিষ্ট কিছু পূর্বশর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবে না।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই।
