ইসরাইলি বিশ্লেষকরা বর্ণনা করেছেন যে, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলবে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন দাবির পর দেশটিতে হতাশা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে একের পর এক হামলার হুমকি এবং কোনো আলোচনা হওয়ার বিষয়ে ইরানের সরাসরি অস্বীকৃতি সত্ত্বেও ট্রাম্প এই মন্তব্য করেছেন। পুরো যুদ্ধজুড়ে ইসরাইলি নেতারা নিজেদের ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সম্মুখভাগে উপস্থাপন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রায়ই গর্ব করে বলেছেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি করিয়েছেন, যাকে তিনি বারবার ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর সোমবার (২৩ মার্চ) এক ভিডিও বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করেন যে [ইসরাইলি ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর] অর্জিত ‘বিশাল সাফল্যগুলোকে’ কাজে লাগিয়ে একটি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব… যা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রক্ষা করবে।
নেতানিয়াহু আরও যোগ করেন, এর পাশাপাশি আমরা ইরান এবং লেবানন উভয় স্থানেই হামলা অব্যাহত রেখেছি। আমরা পদ্ধতিগতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করছি এবং হিজবুল্লাহর ওপর জোরালো আঘাত হেনে চলছি।
এসব দাবি সত্ত্বেও, ইসরাইলের অনেক মানুষ স্পষ্টভাবে সচেতন যে যুদ্ধের শুরুতে তাদের কাছে বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যে এটি ইরানি সরকারকে উৎখাত করবে এবং দেশটির পক্ষ থেকে আসা হুমকির অবসান ঘটাবে। কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনও টিকে আছে এবং গত কয়েক দিনে ইসরাইলে প্রাণঘাতী ইরানি হামলা অব্যাহত রয়েছে; এমতাবস্থায় আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়টি অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর।
সাবেক ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিনকাস বলেছেন, নেতানিয়াহুর আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প যদি আলোচনার জন্য চাপ দিয়ে থাকেন, তবে এটি একটি সংকেত হতে পারে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুঝতে পেরেছেন বিজয় কতটা দ্রুত ও জোরালো হবে এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন কতটা কার্যকর—সে বিষয়ে নেতানিয়াহু তাকে (ট্রাম্পকে) ধোঁকা দিয়ে থাকতে পারেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, আলোচনার বিষয়ে আগে থেকে ইসরাইলের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এটি মূলত নেতানিয়াহুর সেই প্রচেষ্টার একটি কঠোর প্রত্যাখ্যান, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। তেল আবিব থেকে তিনি বলেন, এটি কি নেতানিয়াহুর পরাজয়? অবশ্যই হ্যাঁ! ট্রাম্প মূলত ইসরাইলকে ত্যাগ করছেন। আপাতত আমরা লেবানন ধ্বংস করতে পারব এবং গাজাকে অভুক্ত রাখতে পারব, কিন্তু আমরা এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশ কথা বলতে চাইবে—সেই ধারণা এখন শেষ। কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায় না।
লক্ষ্য কি অর্জিত হয়েছে
নেতানিয়াহু এবং ইসরাইলের কট্টরপন্থীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থনের ওপর অনেক ভরসা করেছিলেন। ২০২৪ সালে ট্রাম্পের বিজয়কে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী উদযাপন করেছিলেন এবং একে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
তবে ট্রাম্পের অভাবনীয় আচরণ এবং দুই দেশের শক্তির বিশাল ভারসাম্যহীনতার কারণে বিভিন্ন সময় উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। যেমন—২০২৫ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র গাজায় ইসরাইলের ওপর যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দিয়েছিল এবং ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল।
ইসরাইলি রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ভূমিকার কারণে কিছু বিশ্লেষক পরামর্শ দিয়েছেন যে, বর্তমান আলোচনায় ইসরাইল কোণঠাসা হয়ে পড়লেও এটি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অর্জিত সাফল্যকে অস্বীকার করে না।
বার্লিন থেকে ইসরাইলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোড ফ্ল্যাফেনবার্গ বলেন, আমি মনে করি না যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ইসরাইল জড়িত থাকবে এমন কোনো প্রত্যাশা ছিল। ইসরাইল এখন আর এমন দেশ নয় যারা কূটনীতি করে। তবে আমি সন্দিহান যে নেতানিয়াহু আসলে কখনো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বিষয়ে সিরিয়াস ছিলেন কিনা। যদি থাকতেন, তবে তিনি ইরান সরকারের ভেতরে থাকা সেইসব ব্যক্তিদের হত্যা বা তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করতেন না যারা এটি ঘটাতে পারত।
তিনি আরও বলেন, পরিবর্তে যদি আপনি ধরে নেন যে এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা হ্রাস করা, তবে তিনি তা করেছেন। আর তিনি এটি এমনভাবে করেছেন যা নিশ্চিত করবে যে ইরান যাতে ভবিষ্যতে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি বজায় থাকবে।
সূত্র: আল জাজিরা।
