চেক রিপাবলিকের সাবেক প্রেসিডেন্ট ভ্যাকলাভ হাভেল তার বই ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য পাওয়ারলেস’-এ এমন এক ব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে মিথ্যা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বরং সেটাই ভিত্তি। এমন এক ব্যবস্থা, যা শুধু মিথ্যাকে সহ্যই করে না, বরং সেটিকে প্রয়োজন করে, পুনরুৎপাদন করে, তার ভেতরেই বাস করে।
চেক ওই লেখকের ভাষায়, ‘এই শাসনব্যবস্থা নিজের মিথ্যার কাছেই বন্দি, তাই তাকে সবকিছুই বিকৃত করতে হয়।’ হাভেল শেষ পর্যায়ের কমিউনিজমে যে বিষয়টি শনাক্ত করেছিলেন, তা শুধু দমন-পীড়ন নয়। বরং আরও সূক্ষ্ম কিছু—এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে ভাষা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আর সত্যের জায়গা নেয় অভিনয়।
আজ সেই বিশ্লেষণ অস্বস্তিকরভাবে বর্তমান সময়ের সঙ্গেই মিলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা এখন আর শুধু ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়—এটি শাসনের একটি পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ৩০ হাজারেরও বেশি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি করেছিলেন—গড়ে দিনে ২০টিরও বেশি। আর শেষ বছরে তা প্রায় ৪০টিতে পৌঁছায়।
এটি একটা দুটো অসাবধানতাবশত বিকৃতি ছিল না। এটি ছিল শিল্পের মতো সংগঠিত, পদ্ধতিগত, নিরবচ্ছিন্ন। ফ্যাক্ট-চেকারদের এমনকি নতুন শব্দ তৈরি করতে হয়েছিল—‘বটমলেস পিনোকিও’, অর্থাৎ এমন দাবি যা এতবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে যে তা আর ভুল বলেও ধরা যায় না। কিছু দাবি তিনি ডজন ডজন, এমনকি শত শতবার পুনরাবৃত্তি করেছেন।
এটি ছিল কেবল তার প্রথম মেয়াদের কথা। দ্বিতীয় মেয়াদেও প্রবণতা থেকে বিচ্যুতি হয়নি। বরং তার আরও বিস্তার হয়েছে। এর পরিসর বেড়েছে, গুরুত্ব গভীর হয়েছে—আর এর পরিণতি এখন বৈশ্বিক। এখন তা যুদ্ধের মধ্যেও প্রবেশ করেছে।
মিথ্যার ধারাবাহিকতা
এখানেও প্রথম যে জিনিসটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা হলো ভাষা। ট্রাম্প সচেতনভাবেই এই ঘটনাকে ‘যুদ্ধ’ বলতে অস্বীকার করেছেন। তিনি এটিকে বলেছেন ‘অপারেশন’, ‘সীমিত মিশন’, এমনকি ‘একটি অভিযান’। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন, বিমানবাহী রণতরী পুনর্বিন্যাস, বিমান শক্তি সক্রিয়, বিশেষ বাহিনী মোতায়েন—এসব যুদ্ধ না হয়ে কিভাবে পারে!
তবে ট্রাম্প সীমিত পদক্ষেপ হিসেবে সব দেখাতে চেয়েছিল। তা যদিও পরে ধীরে ধীরে বিস্তৃত সংঘাতে পরিণত হয়েছে। যা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করার হুমকি তৈরি করছে। যে যুদ্ধ কয়েক ঘণ্টা চলার কথা ছিল, তা দিন, তারপর সপ্তাহে গড়িয়েছে। এখনও এর শেষ দেখা যাচ্ছে না।
এটি যেন বাজারব্যবস্থাকে সরকার ও সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করা—সবকিছুই দরকষাকষির বিষয়। এমনকি সত্যও হয়ে যায় একটি লেনদেনের উপকরণ। গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে। কিন্তু কয়েক মাস পর আবার সেই কর্মসূচিকেই তিনি নতুন সামরিক পদক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, একই সঙ্গে সেটি ধ্বংসও এবং বিদ্যমানও। এরপর শুরু হয় ধারাবাহিক মিথ্যার প্রবাহ।
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে—যখন বাস্তবে উপসাগরে উত্তেজনা বাড়ছিল এবং মার্কিন বাহিনী প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যাচ্ছিল। তিনি বলেন, ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে তেহরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবে আঘাত হানছিল।
গত সপ্তাহে তিনি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি দেন। যা বিশ্ববাজার ও সরকারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। তারপর হঠাৎ করেই তিনি ‘ভালো ও ফলপ্রসূ’ আলোচনার কথা বলেন। দাবি করেন, ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে। যা ইরানের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে অস্বীকার করেন।
তবুও ট্রাম্প থামেননি। তিনি বারবার বিজয়ের ঘোষণা দিয়ে গেছেন। যখন বাস্তবে যুদ্ধ চলছেই এবং উত্তেজনা বাড়ছেই।
সত্যের ওপর আঘাত
বিজয় অর্জিত হয়নি—তা শুধু ঘোষণা করা হয়েছে এবং প্রতিবারই বাস্তবতা তা অতিক্রম করে গেছে। কোনো সরকার পতন হয়নি, কোনো রাষ্ট্র পরাজিত হয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি, যে এখনও কার্যকর, আঘাত হানতে সক্ষম এবং টিকে আছে।
এই জায়গায় এসে জর্জ অরওয়েলকে মনে পড়ে। এমন ব্যবস্থায় ভাষা উল্টে যায়— ‘যুদ্ধ হয়ে যায় শান্তি, ধ্বংস হয়ে যায় স্থিতিশীলতা।’ কিন্তু ট্রাম্পের পদ্ধতি আরও এক ধাপ এগিয়ে। তার ‘fake news’ শব্দের নিরন্তর ব্যবহার। যা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও প্রতিধ্বনিত করেন। এটি শুধু গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ নয়, বরং সত্যের অস্তিত্বের ওপরই আঘাত।
উদ্দেশ্য হলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। যাতে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা এতটাই ঝাপসা হয়ে যায় যে মানুষ আর কোনো কিছুকেই বিশ্বাস করতে না পারে। সত্য মনে হয় মিথ্যা, আর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা মিথ্যা হয়ে ওঠে সত্য। মানুষ আর সত্য খোঁজে না—শুধু দেখে কী বলা হচ্ছে।
প্রহসনের রূপ
কখনও কখনও এই নাটক প্রহসনে রূপ নেয়। এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ইরানের নেতৃত্ব নাকি তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে চাইছে—এরপর নাটকীয়ভাবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন, ‘না ধন্যবাদ, আমি সেটা চাই না।’
যে ধরনের দাবি কল্পকাহিনীতেও গ্রহণযোগ্য হতো না, তা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের মঞ্চ থেকে বলা হচ্ছে এবং হাততালি পাচ্ছে। এটিই আসল বিষয়। যখন মিথ্যা পদ্ধতিগত হয়ে যায়, তখন অযৌক্তিকতাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প এমন এক বাণিজ্যিক মানসিকতার প্রতীক, যা ক্ষমতার ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। তিনি শাসন করেন যেমন ব্যবসা করতেন। সীমাহীন চুক্তি, নীতিহীন চাপ, লাগামহীন লোভ। তবে এটি রাষ্ট্রচালনা নয়—এটি বাজারব্যবস্থার সাম্রাজ্যিক রূপ, যেখানে সবকিছুই লেনদেনযোগ্য। এমনকি সত্যও।
দ্বিগুণ হয়ে ওঠা এক বিদূষক
ট্রাম্প শুধু একজন ব্যবসায়ী নন—তিনি এমন একজন, যিনি নিজের আকর্ষণে অতিরিক্ত বিশ্বাস করেন। তিনি আত্মনির্মিত নন, বরং আত্মবিশ্বাসে নির্মিত। উত্তরাধিকারকে তিনি প্রতিভা হিসেবে উপস্থাপন করেন। এর ফলে তৈরি হয়েছে এক নাটকীয় মানসিকতা—যেখানে তিনি অহংকার ও ক্ষোভ, মহিমা ও সন্দেহের মধ্যে দোদুল্যমান। তিনি শুধু বিশ্বাস করেন না যে তিনি সঠিক—তিনি বিশ্বাস করেন বাস্তবতাকেই তার কথার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
তিনি বাস্তবতা বর্ণনা করেন না—তিনি তা মঞ্চস্থ করেন। তার বক্তব্য সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে নয়—বরং প্রভাব সৃষ্টি, বিস্মিত করা, মুগ্ধ করার জন্য। সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ নয়—প্রভাবই আসল। বাস্তবতা বাধা দিলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তথ্য বিরোধিতা করলে তিনি তা বদলে দেন। বিশ্ব সন্দেহ করলে তিনি আরও জোর দেন—কারণ তিনি বিশ্বাস করেন পুনরাবৃত্তিই সত্যের বিকল্প হতে পারে।
বিশ্ব আর আগের মতো নেই
তার পাশে আছেন পিট হেগসেথ, যার বক্তব্যে ধর্মীয় আবহ ও সভ্যতার সংঘর্ষের ধারণা যুক্ত হয়। যেখানে যুদ্ধকে এক ধরনের নিয়তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এটি ধর্মীয় ভাষায় মোড়ানো এক ধরনের সহিংসতা—যার ফল শক্তি নয়, বরং প্রদর্শনী।
আজ বিশ্ব আর আগের মতো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। মিত্ররা দ্বিধাগ্রস্ত, প্রতিদ্বন্দ্বীরা হিসাব করছে। সংকটের মুহূর্তে দীর্ঘদিনের মিত্ররাও পিছু হটছে। ফ্রান্স বিরোধিতা করছে, জার্মানি দ্বিধায়, এমনকি যুক্তরাজ্যও সীমিত সমর্থন দিচ্ছে।
এই দৃশ্য নতুন নয়। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেন বুঝেছিলেন—ক্ষমতা তখনই ভেঙে পড়ে, যখন তা আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। এখন সেই পরিবর্তনই ঘটছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে আর আগের মতো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না। তাকে দেখা হচ্ছে—কিন্তু নীরবে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। স্থিতিশীল নেতৃত্ব হিসেবে নয়, বরং এক অস্থির শক্তি হিসেবে। একটি প্রদর্শনী। এক অভিনয়। এক প্রহসন। আর এর কেন্দ্রবিন্দুতে—এক বিদূষক। এক বিপজ্জনক বিদূষক, যিনি একটি পরাশক্তির হাল ধরেছেন। এটি সাধারণ হাস্যরস নয়। এটি অন্ধকার হাস্যরস।
