হোয়াইট হাউসে এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও।
হেগসেথ বলেছেন, ইরানের হাতে থাকা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ভবিষ্যতে লন্ডন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিষয়টি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি নতুন ধরনের ঝুঁকির সম্ভাবনা তৈরি করছে।
২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ২০ মার্চের একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়। সেদিন ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে অবস্থিত ব্রিটিশ-আমেরিকান যৌথ সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। দ্বীপটি আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মাঝামাঝি অবস্থিত এবং আয়তনে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার। দেখতে অনেকটা পুলের মতো এই দ্বীপটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষেপণাস্ত্র দুটির একটি মাঝপথেই ভেঙে পড়ে এবং অন্যটি আকাশেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। ফলে কোনো ধরনের প্রাণহানি বা বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাজ্য সরকার নিশ্চিত করেছে যে, এই হামলায় কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব। আগে ধারণা করা হতো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই ঘটনার পর ধারণা করা হচ্ছে, তারা হয়ত এর চেয়েও অনেক বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম।
অস্ট্রেলিয়ার একটি সংবাদমাধ্যমও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, ইরান এই হামলার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছে—তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। দিয়েগো গার্সিয়ার দূরত্ব ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার হওয়ায় এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।
যদিও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি, তবুও ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) মনে করছে, এই প্রথম কোনো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এত দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করেছে। এর আগে এমন সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুত্তে বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। অপরদিকে, ইরান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে যে তারা কোনো সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়নি।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, ইরান ক্রমাগত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং তা ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার জন্য বড় ধরনের হুমকি হতে পারে। তবে ব্রিটিশ সরকার এই দাবি পুরোপুরি মেনে নেয়নি এবং জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য বর্তমানে সরাসরি কোনো ঝুঁকিতে নেই।
দূরত্বের হিসেবে দেখা যায়, তেহরান থেকে বার্লিনের দূরত্ব প্রায় ৩৫০০ কিলোমিটার, প্যারিসের দূরত্ব প্রায় ৪২০০ কিলোমিটার এবং লন্ডনের দূরত্ব প্রায় ৪৪০০ কিলোমিটার। এই হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় পড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে এত দূর পর্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত হানা খুবই কঠিন। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের একজন বিশ্লেষক জানান, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়ানো সম্ভব হলেও এতে এর নির্ভুলতা কমে যায়।
অন্য গবেষকরাও একমত পোষণ করে বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লন্ডন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে—এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে বাস্তবে সেই ঝুঁকি খুব কম। এর একটি বড় কারণ হলো, যুক্তরাজ্য ন্যাটোর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে, যা সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম।
বর্তমানে ইরানের কাছে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যার মধ্যে কিছু স্বল্পপাল্লার এবং কিছু মধ্যম পাল্লার। তবে দীর্ঘপাল্লার সক্ষমতা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান হয়ত তাদের মহাকাশ কর্মসূচি বা ভবিষ্যৎ সামরিক প্রয়োজনের জন্য এই ধরনের দীর্ঘপাল্লার প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ থাকলেও, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের জন্য তাৎক্ষণিক বড় ধরনের হুমকির সম্ভাবনা এখনো কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভবিষ্যতে ন্যাটো এবং পশ্চিমা দেশগুলোর পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়।
সূত্র: এবিসি নিউজ, বিবিসি
