করাপশন টক
মঙ্গলবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মার্কিন স্থল সেনাদের জন্য যে ‘নরক’ তৈরি করেছে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেক্স:
মার্চ ৩১, ২০২৬ ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ইরানে আগ্রাসন বন্ধে আলোচনার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের খারগ দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালি দখলে নেওয়ার জন্য স্থল হামলা চালাতে এই ‘বিল্ডআপ’ বলে গুঞ্জন আছে।

এ কারণে সবার নজর এখন হরমুজ প্রণালিতে, যে সমুদ্রপথে বিশ্বের ৩০ শতাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়। একই সঙ্গে খারগ দ্বীপ হলো ইরানের লাইফলাইন, যা দেশটির প্রধান জ্বালানি কেন্দ্র। তবে বিষয়টি কি এতোই সহজ? ইরান কি মার্কিন সেনাদের হামলার মুখে অতি-গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ ও পানিপথ তাদের বিলিয়ে দেবে?

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে যায়, সেই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়ায় তেহরানের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি অবিলম্বে এই জলপথ খুলে না দেয় তবে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়ানো হবে, কিন্তু খারগ দ্বীপে মার্কিন স্থল হামলা শুরু হলে তা সংঘাতকে বড় ধরনের রূপ দেবে এবং ইরানের পক্ষ থেকে চরম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। কারণ, দ্বীপটি তেহরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন এবং দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি এখান থেকেই হয়।

ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্কিন-ইসরাইলি বিমান অভিযানে ২২ সহস্রাধিক বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইরান কিছুটা দুর্বল হলেও, সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে—পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সৈন্য, ঘাঁটি ও মিত্রদের ক্ষতি করার এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করার মতো অস্ত্র ও কৌশল এখনও তেহরানের হাতে রয়েছে।

তেহরান যেভাবে পাল্টা জবাব দিতে পারে তার প্রথম উপায়টি নিচে দেওয়া হলো:

মার্কিন সেনাদের ওপর সরাসরি হামলা

মার্কিন বাহিনী ইরানি ভূখণ্ডে পা রাখলে সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হবে তাদের ওপর সরাসরি আক্রমণ। ইরান উপকূল থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে অবস্থিত খারগ দ্বীপে মূল ভূখণ্ড থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সহজেই আঘাত হানা সম্ভব। হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ব্রায়ান ক্লার্কের মতে, দ্বীপে এখনও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বাহিনী থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আপনারা সেখানে স্থল প্রতিরোধ এবং সরাসরি বন্দুকযুদ্ধ দেখতে পাবেন। আমার ধারণা, তারা পুরো দ্বীপে মরণফাঁদ পেতে রেখেছে। মার্কিন সৈন্যরা সেখানে গেলে তাদের জন্য প্রচুর আইইডি এবং অন্যান্য চমক অপেক্ষা করছে। কারণ ইরানিদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো—একবার যুক্তরাষ্ট্র এটি দখলের চেষ্টা করলে সেখান থেকে নিকট ভবিষ্যতে তেল উৎপাদন সম্ভব হবে না, তাই তারা চাইবে মার্কিন সেনাদের হতাহত করে ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে।’

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের জো কস্তা জানিয়েছেন, ইরানের এখনও রকেট, ড্রোন, মাইন ও দ্রুতগামী আক্রমণকারী নৌযানের মাধ্যমে মার্কিন সেনাদের ওপর আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে। মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শাসনামলে পেন্টাগনের যুদ্ধ পরিকল্পনা তদারকিতে সহায়তাকারী সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষমতা তাদের কতটা আছে তা এখনও অস্পষ্ট। তবে তারা যেভাবে এই অঞ্চলের অবকাঠামোতে সফলভাবে আঘাত হানছে, তা নির্দেশ করে যে তাদের ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ কাঠামো এখনও কার্যকর রয়েছে।

তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের ১ লাখ ৯০ হাজারের বেশি সদস্যের বিশাল সেনাবাহিনী থাকার অর্থ হলো—এই দ্বীপ বা হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের যেকোনো সামরিক প্রচেষ্টা খুব দ্রুত একটি ‘বিদ্রোহ দমনের মতো যুদ্ধে’ রূপ নিতে পারে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, ইরানিরা নিঃসন্দেহে তাদের আক্রমণের বড় অংশ খারগ দ্বীপ এবং আশেপাশে থাকা সম্ভাব্য মার্কিন অবস্থানের দিকে পরিচালিত করবে। কারণ, তারা খুব ভালো করেই জানে যে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে। হতাহতের সংখ্যা বাড়িয়ে জনমতকে নেতিবাচক করার চেয়ে দ্রুত কোনো উপায় আর নেই।

উপসাগরীয় তেল কেন্দ্রগুলোতে হামলা

মার্কিন স্থল অভিযানের ফলে এই অঞ্চলের, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের হামলা আরও জোরদার হতে পারে।

কেটো ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গবেষক জন হফম্যান বলেন, এতদিন তারা এসব জায়গায় হামলা করার ক্ষেত্রে কিছুটা সংযত ছিল, কিন্তু তারা দেখিয়েছে যে তারা উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দিতে পারে। তেল ও অবকাঠামোতে হামলা হতে পারে। আপনি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলোতেও হামলা দেখতে পারেন।

তিনি আরও যোগ করেন, তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ট্রাম্পের গলায় ফাঁসের দড়ি আরও শক্ত করা, আর সেই দড়িটি হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান দামকে মূলত কম গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন এবং দাবি করছেন যে এই অর্থনৈতিক কষ্ট হবে সাময়িক। তবে বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত বা তীব্রতর হলে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের ওপর এই ধাক্কা আরও গভীর হবে।

এদিকে ক্যাম্পবেল বলেন, তেহরান ইতোমধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলের অরক্ষিত ও সংবেদনশীল গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি বন্দর ও বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মানসিকতা প্রদর্শন করেছে।

উদাহরণস্বরূপ, এই সপ্তাহে একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উত্তর ইসরাইলের একটি খোলা জায়গায় আঘাত হেনেছে, যা মূলত দেশটির বৃহত্তম বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমি সন্দেহ করছি যে এটি নিশ্চিতভাবেই তাদের প্রতিক্রিয়ার অংশ হবে।’

প্রক্সি বা অনুগত গোষ্ঠীগুলোর হামলা বৃদ্ধি

যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরাকি মিলিশিয়া এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো ইরানের অনুগত গোষ্ঠীগুলো ইসরাইল, উপসাগরীয় দেশ এবং এই অঞ্চলে মার্কিন অবস্থানগুলোতে পাল্টা আঘাত হেনেছে।

এই মাসে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস এবং ইরাকের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু বেশ কয়েকবার রকেট ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে, যার জন্য ইরাকি মিলিশিয়াদের দায়ী করা হয়।

হফম্যানের মতে, এই গোষ্ঠীগুলো যেকোনো সময় তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, ইরাকি মিলিশিয়ারা এই যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়ানোর ইচ্ছা পোষণ করেছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহও দেখিয়েছে যে তাদের এখনও ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা রয়েছে।

হফম্যান আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি লড়াই আরও জোরালো করে, তবে ইয়েমেনের হুথিরাও ‘খুব দ্রুত লোহিত সাগরের দিকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা ঘুরিয়ে দিতে পারে।’

এমনটি ঘটার সম্ভাবনা প্রবল, কারণ গত শুক্রবার হুথিরা ইরানকে সমর্থনের জন্য এই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

ক্লার্কের মতে, ওয়াশিংটন গত মে মাসে বিমান হামলার মাধ্যমে হুথি বাহিনীর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এখন সম্ভবত বিদ্রোহীদের পেতে রাখা মাইনের মোকাবিলা করতে হতে পারে, যা জাহাজ চলাচলের পথকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে।

প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে জো কস্তা বলেন, একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে তারা কিছুটা সংযত ছিল, তবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যথেষ্ট সক্ষমতা তাদের আছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ ও গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত হয়তো তারা অপেক্ষা করার পরিকল্পনা করেছিল, আর এভাবেই আমরা সংঘাতের একটি ক্রমবর্ধমান চক্রে প্রবেশ করছি।

হুথিদের লোহিত সাগর প্রণালি অবরোধ

ইরান শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, বরং আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। লোহিত সাগরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ রয়েছে যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত জরুরি: ‘বাব আল-মান্দাব’ প্রণালি।

গত সপ্তাহের শেষ দিক থেকে ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে দিয়েছে যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তেহরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে ইরান ‘বাব আল-মান্দাব এবং লোহিত সাগরসহ অন্যান্য প্রণালিতেও অস্থিরতা বাড়িয়ে দেবে।’

বুধবার ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে এক সামরিক সূত্র জানিয়েছে, শত্রুরা যদি ইরানের দ্বীপপুঞ্জ বা আমাদের ভূখণ্ডের অন্য কোথাও স্থল অভিযান চালাতে চায়, কিংবা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে নৌ-তৎপরতার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়, তবে আমরা তাদের চমকে দিয়ে নতুন ফ্রন্ট বা রণক্ষেত্র খুলে দেব। এতে তাদের কোনো লাভ তো হবেই না, বরং ক্ষয়ক্ষতি দ্বিগুণ হবে।

বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ২০ মাইল প্রশস্ত এই বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে পার হয়। এর আগেও হুথিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জাহাজে হামলা চালিয়ে এই প্রণালিটি অবরোধ করেছিল।

জো কস্তা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আমরা হুথিদের নিয়ে ব্যাপক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম, অথচ তারা ইরানের মতো অতটা শক্তিশালী ছিল না। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সক্ষমতা তাদের অবশ্যই আছে। তারা প্রমাণ করেছে যে দেড় বছর আগের মতোই লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার এবং হয়রানি করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।

তিনি আরও যোগ করেন, এটি একটি দ্বিমুখী সংকট তৈরি করবে, যেখানে মার্কিন, ইসরাইলি এবং অন্যান্য বাহিনীকে এখন একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন ফ্রন্টের পরিস্থিতি সামলাতে হবে।

সূত্র: দ্য হিল।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।