বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, জাতির সুস্থতা, আনন্দ ও গৌরব খেলাধুলাতেই নিহিত। তাই জাতীয় জীবনে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের প্রয়োজন সুস্থ ও আনন্দময় জীবন। খেলাধুলা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ নেই— ফলে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।’
সোমবার দুপুরে বিপিজেএ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইম্পিরিয়াল হোটেল বিপিজেএ সভাপতি একেএম মহসীনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক বাবুল তালুকদারের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন- মশিউর রহমান সুমন, জাহিদুল ইসলাম সজল, সালেকুজ্জামান রাজীব, ফরিদ উদ্দীন সিদ্দীকী, মো. সৌরভ, খোকন শিকদার, ফেনী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সিদ্দিক আল মামুন প্রমুখ।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সুস্থ দেহ সুস্থ মন— এই চিরন্তন বাক্যটি আমাদের খেলাধুলার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। খেলাধুলা শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, পেশী মজবুত করে এবং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। অথচ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টিকে আমরা বরাবরই উপেক্ষা করে আসছি।
তিনি বলেন, শিশুর বিকাশের মূলে রয়েছে খেলাধুলা। শিশুরা খেলার মাধ্যমে তাদের বিশ্ব সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং শেখে। তারা তাদের চারপাশের পরিবেশের সন্ধান করে। তাদের আবেগ প্রকাশ করে এবং কৌতুকপূর্ণ মুহূর্তের মাধ্যমে তাদের শব্দভাণ্ডার তৈরি করে। দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য এখন আর শিশুদের খেলার মাঠে খুব একটা দেখা যায় না। ভোর সকালে সূর্যের মুখ দেখা যেতে না যেতেই ছেলেমেয়েরা একগাদা বই কাঁধে নিয়ে অথবা কোচিং সেন্টারের দিকে ছোটে। সারা দিন ক্লাসশেষে তারপর ঘরে ফেরা। অনেকের কপালে এই সৌভাগ্যটুকুও জোটে না। স্কুলশেষে অনেক ছেলেমেয়েই প্রাইভেট বা কোচিংপানে ছোটে। আমাদের শিশুদের একটা বড় অংশই পড়াশোনার চাপে পিষ্ট হয়ে খেলার মাঠে যাওয়ার সুযোগও পায় না। অনেকে খেলাধুলাকে পাশ কাটিয়েই চলে। ভাবটা এমন যে, খেলাধুলা করে হবেটা কী! তার চেয়ে বরং মোবাইলে একটু গেম খেলা কিংবা একটু টেলিভিশন দেখাও ভালো! এভাবে স্মার্টফোন এবং আকাশসংস্কৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মকে গ্রাস করে ফেলেছে।
শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা স্কুল থেকে ফিরে এসে বাড়িতে বই রেখে সামান্য কিছু মুখে দিয়েই খেলার মাঠে ছুটে যেতাম। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডিসহ অনেক খেলাই চলত সমানতালে। কই পরীক্ষার সময় তো কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখিনি! বরং যেসব ছেলেমেয়ে খেলাবিমুখ ছিল, দিনদিন তাদেরই পিছিয়ে পড়তে দেখেছি। প্রবলভাবে খেলার মাঠের অভাব আমাদের দিনদিন খেলাধুলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। ছোটবেলায় প্রতিটা স্কুল-কলেজে মহা ধুমধামের সঙ্গে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। যে স্কুল বা কলেজে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো তার আশপাশের এলাকায় একটা সাজ সাজ রব পড়ে যেত। মানুষ দলে দলে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা দেখতে ছুটে আসত। এখন গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হলেও শহরের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এসব প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় না। হবে কীভাবে! স্কুলগুলোতে যে খেলার মাঠই নেই! নির্মম সত্য হলো, ধীরে ধীরে দেশে খেলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। অথচ উচিত ছিল জনসংখ্যা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুপাতে খেলার মাঠের সংখ্যা বাড়ানো। কিন্তু তা হয়নি।
গ্রামাঞ্চলে কম হলেও কিছু কিছু খেলার মাঠ আছে। কিন্তু শহরের অবস্থা একেবারেই বেহাল। অপরিকল্পিত নগরায়ন শহরের বুকের এক চিলতে খেলার মাঠকেও গিলে খেয়েছে। খেলাধুলার সামান্য জায়গাও অবশিষ্ট নেই। তাহলে কীভাবে আমাদের দেশ থেকে তৈরি হবে একজন পেলে, ম্যারাডোনা, রোনাল্ডো, নেইমার, মেসি কিংবা ব্রায়ান লারার মতো সেরা খেলোয়াড়!
সাংবাদিকদের এই নেতা প্রশ্ন রাখেন- স্কুল থাকবে, মাঠ থাকবে না, শিক্ষার্থীরা খেলতে পারবে না— এটা কি ভাবা যায়? মাঠের অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় খেলাধুলার চর্চা নেই, নেই সাংস্কৃতিক পরিবেশ। এ দিকে নজর দেওয়ার যেন কারো সময় নেই। শিক্ষার পাশাপাশি এই চর্চাগুলো নিশ্চিত না করলে জাতি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।’
সরকারকে এ বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বছরে দুই-চারটি টুর্ণামেন্ট আয়োজন রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শারীরিক শিক্ষার প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলেও বিষয়টি অবহেলিত, বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে। তাই কলেজ পর্যায়ে শারীরিক শিক্ষা বিষয়টি চালু করা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রভাষক পদে উন্নীত করা উচিত।’
বর্তমান প্রজন্মের মোবাইল ফোন আসক্তিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশের স্কুল ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এখন মাঠে যেতে চায় না। তারা স্ক্রিনেই সময় কাটায় বেশি, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর ফলে ভবিষ্যতে একটি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ জাতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, খেলাধুলা শুধু ছোটদের জন্যই নয় বড়দের জন্যও সমান প্রয়োজন। তাই ছোট বাচ্চাদের খেলার উপকারিতা শেখাতে গিয়ে নিজের ব্যাপারটাও ভুলে যাবেন না। ঘর ও কাজের মাঝে প্রতিদিন ৩০ মিনিট সময় বের করুন খেলার জন্য, পরিবারের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করুন। আর অবশ্যই একে বাধ্যবাধকতা না মনে করে খেলাকে শখ হিসেবে গ্রহণ করুন, পরিবারের সঙ্গে খেললে পারিবারিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে সেই সঙ্গে সময়টাও আনন্দে কাটবে।
সূত্র: যুগান্তর।
