করাপশন টক
শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জেন্ডার সমতা অর্জন ও নারীদের ক্ষমতায়ন

editor
ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫ ৮:০৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এস কে দেব লিটন: নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ নয়, এটি একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের অন্যতম মূলভিত্তি। সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন একটি জাতির সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত। বিশ্বব্যাপী নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা অনেক দেশকে উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।

আধুনিক বিশ্বে নারীর উন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপ করে বহু উন্নত দেশ সফলতা অর্জন করেছে। জাপান এ ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হতে পারে, যেখানে নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে জাপানে নারীদের কর্মসংস্থানে প্রবেশের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল, তবে ১৯৯৯ সালে “Basic Law for a Gender-Equal Society” আইন প্রণীত হওয়ার পর থেকে দেশটিতে নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। কর্মজীবী নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, কর্পোরেট ব্যবস্থাপনায় নারীদের অন্তর্ভুক্তি, উদ্যোক্তা সহায়তা, কর্মক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি প্রতিরোধ আইনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশেও নারীর উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, নারী শিক্ষা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে, এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যেমন—নারী নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, গৃহস্থালি শ্রমের স্বীকৃতির অভাব, এবং আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সীমাবদ্ধতা।

বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোতে নারীদের আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হলে বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই পরিকল্পনার প্রয়োজন। নারীদের প্রতি বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে তাদের ক্ষমতায়নের জন্য শক্তিশালী নীতি গ্রহণ করতে হবে। কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সহায়তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে এবং দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

নারীর উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে—নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, এবং বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী নারীদের কল্যাণ। এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকা শক্তি হতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের প্রতিষ্ঠিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে নারীদের কর্মসংস্থান এখনো অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিশেষ করে শহরের বাইরে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে নারীরা এখনো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। কর্মসংস্থানের হার বৃদ্ধির জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকার যদি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও সহায়তা প্রদান করে, তাহলে তারা আরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে।
জেন্ডার সমতা

জেন্ডার সমতা অর্জন এবং সকল নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়নে যে সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন :

১। সর্বত্র সকল নারী ও মেয়ের বিরুদ্ধে সকল ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটানো।

২। পাচার, যৌন হয়রানি ও অন্যসব ধরনের শোষণ-বঞ্চনা সহ ঘরে বাইরে সকল নারী ও মেয়ের বিরুদ্ধে সকল ধরনের সহিংসতার অবসান।

৩। শিশুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক বিবাহ’র মতো সকল ধরনের ক্ষতিকর প্রার অবসান।

৪। সরকারি সেবা, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষা নীতিমালার মাধ্যমে অবৈতনিক পরিচর্যাকার্য ও গৃহস্থালি কাজের মর্যাদা ও স্বীকৃতিদান এবং বাসা ও পরিবারের অভ্যন্তরে জাতীয়ভাবে যুক্তিযুক্ত অংশীদারিত্বমূলক দায়িত্বপালনকে উৎসাহিত করা।

৫। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সকল পর্যায়ে নেতৃত্ব দানের জন্য নারীদের পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর অংশগ্রহণ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

৬। জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন ও বেইজিং প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশন এবং এদের পর্যালোচনামূলক সম্মেলনসমূহের ফলাফল-দলিলের আলোকে স্বীকৃত যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং প্রজনন অধিকারের ক্ষেত্রে নারীদের সার্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

৭। বিদ্যমান জাতীয় আইনকানুনের আলোকে, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং ভূমিসহ সকল প্রকার সম্পত্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক সেবা, উত্তরাধিকার এবং প্রাকৃতিক সম্পদে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ সম্পাদন।

৮। নারীদের ক্ষমতায়নে সহায়ক প্রযুক্তি, বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।

৯। সকল পর্যায়ে নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন এবং নারী পুরুষ সমতা আনয়নে যথাযথ নীতিমালা ও প্রয়োগযোগ্য আইনি বিধান প্রণয়ন ও শক্তিশালী করা।

নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তবে এসব উদ্যোগকে আরও কার্যকর করতে হলে বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। বিশ্বে যে জাতি নারীদের শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে, সেই জাতিই উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে—বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে পারে না। সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং জাপানের মতো উন্নত দেশগুলো নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও সিদ্ধান্তগ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ যদি এই মডেল অনুসরণ করে, তবে দেশের নারী সমাজ আরও স্বাবলম্বী হয়ে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে। নারীর ক্ষমতায়ন শুধু তাদের ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। তাই এখনই সময় নারীদের এগিয়ে নেওয়ার, এখনই সময় সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ার!

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।