এস. কে. দেব লিটন : বিদেশী কয়লার দাপটে দেশের একমাত্র কয়লাখনি বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানী লিমিটেড এর বিক্রয়মূল্য পুনঃনির্ধারণে হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশংকা করছেন অনেকেই। এ পর্যন্ত কয়লার মূল্য ০৬ বার নির্ধারণ/পুণঃনির্ধারণ করা হয়েছে ২০০১ সালে প্রথম ৬০ মার্কিন ডলারে কয়লা বিক্রি শুরু করে। পরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের (জ্বাখসবি) সিদ্ধান্তে কয়লার মূল্য ৭০, ৮৪, ১০৫, ১৩০, ১৭৬ মার্কিন ডলার পুনঃনির্ধারণ হয়। সর্বশেষ উত্তোলন ব্যয়ের সাথে ১০% মুনাফা যোগ করে কয়লার মূল্য ১৭৬ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে খনির সম্পূর্ণ কয়লা বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র (বপুতাবিকে)-কে সরবরাহ করা হচ্ছে। ২০০৫ সাল হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত খনিটি সাফল্যর সাথে পরিচালত হয়ে আসছে।
২০১১ থেকে ২০১৭ করবছরে জাতীয় পর্যায় করদাতা হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়েছে। ২০০৫ সাল হতে এ পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে প্রায় ৫,৫০০.০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করেছে। ২০২৫ থেকে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র (বপুতাবিকে) সরকারীভাবে নির্ধারিত কয়লার মূল্য ১৭৬.০০ মার্কিন ডলারের পরিবর্তে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৯৪ মা: ডলার হতে ১০৪ মা: ডলার করে পরিশোধ করছে। যার ফলে পিডিবি’র নিকট বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি বকেয়া পাওনা দাড়িয়েছে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা। পিডিবি’র অনুরোধে কয়লার বিক্রয়মূল্য পুনঃনির্ধারনের জন্য বিসিএমসিএল, বিউবো ও হাইড্রোকার্বন ইউনিটের প্রতিনিধিসহ গঠিত কমিটি কয়লার উত্তোলন ব্যয়ের ভিত্তিতে কয়লার বিক্রয়মূল্য ২০২.০০ মা: ডলার পুনঃনির্ধারণের সুপারিশ করে। কমিটিতে বিউবো’র প্রতিনিধিগণ সুপারিশের বিষয়ে একমত না হয়ে প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে অসম্মতি জানায়। এতে কমিটির অপরাপর সদস্যগণ স্বাক্ষর করে রিপোর্ট দাখিল করেন। ওপেন-পিট মাইনিং পদ্ধতির কারণে বিশ্বে কয়লা রপ্তানিকারক দেশগুলো কম মূল্যে কয়লা রপ্তানী করতে পারে।
বড়পুকুরিয়া একটি জটিল ভূ-গর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উৎপাদন করে থাকে। রপ্তানিকারক দেশগুলোর মেশিনারিজ, ইকুইপমেন্টস্, দক্ষ জনশক্তি ও কারিগরী সহায়তা (Technical know-how) সহজলভ্য। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি জমি অধিগ্রহণ বাবদ ব্যয়, মেশিনারিজ, দক্ষ জনশক্তি, কারিগরী সহায়তা ও ইকুইপমেন্টস্ আমদানি নির্ভর হওয়ায় এ খনি হতে কয়লার উৎপাদন খরচ রপ্তানিকারক দেশের FOB (অর্থাৎ জাহাজ ভাড়া, কাস্টমস ডিউটি, অন্যান্য আমদানি শুল্ক, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয় ব্যতীত) মূল্যের থেকে ৩-৪ গুন বেশি। তবে সাথে জাহাজ ভাড়া, কাস্টমস ডিউটি, অন্যান্য আমদানি শুল্ক, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয় ইত্যাদি যোগ করা হলে আমদানীকৃত কয়লার ব্যয় প্রায় ২০০.০০ মার্কিন ডলার হবে। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে ১৯৬ মার্কিন ডলার হতে ৪৩০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত উঠা-নামা করলেও বিসিএমসিএল বিপিডিবি’র নিকট সরকারীভোবে নির্ধারিত মূল্যে ১৭৬ মার্কিন ডলারে কয়লা সরবরাহ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যে দেশ কয়লা রপ্তানি করে মূলত সে দেশের Coal Price Index অনুসারে কয়লার মূল্য নির্ধারণ করা হয় অর্থাৎ অন্য দেশের জন্য এই মূল্য সূচক প্রযোজ্য নয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লা আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য Indonesian Coal Index (ICI), Indonesia, New Castle Index, Australia, Richard Bay Index, South Africa ইত্যাদি । কয়লার বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে রপ্তানিকারক দেশগুলোর মত বাংলাদেশে স্বতন্ত্র কোন রেগুলেটরি বডি সেই। সেখানে পিডিবি’র কর্মকর্তারা কয়লা খনির পরিচালনা পর্ষদের পদ বাগিয়ে নিয়ে ক্রেতা হয়ে বেআইনীভাবে কয়লার মূল্য নির্ধারণে বিক্রেতার ভূমিকা পালন করছে।
গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সুপারিশ মোতাবেক বিপিডিবি জানুয়ারি ২০২৫ মাস হতে ICI-1 এর গড় মূল্যানুযায়ী কয়লার মূল্য পরিশোধ করছে। জানুয়ারি ২০২৫ হতে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে বিপিডিবি কর্তৃক ICI-1 এর গড় মূল্যানুযায়ী কয়লার মূল্য পরিশোধ করায় বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৬৭৩ কোটি টাকা। এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের সাথে চলমান চুক্তির অবশিষ্ট সময়ে অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত বর্তমানের ICI-1 এর গড় মূল্যে অর্থাৎ ৯৪ মার্কিন ডলার টন প্রতি মূল্যে বিপিডিবি বিল পরিশোধ করলে বিসিএমসিএল আরো প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা কম পাবে। ২০০৭ হতে ২০১৮ পর্যন্ত বিউবো’র পাশাপাশি টেন্ডারের ভিত্তিতে দেশের ইটভাটা, ষ্টীল মিলসহ স্থানীয় ক্রেতাদের নিকট সরকারী ভাবে নির্ধারিত মূল্যে থেকে প্রায় ৪০ মার্কিন ডলার হতে ৭২ মার্কিন ডলার বেশি মূল্যে কয়লা বিক্রয় করা হয়েছে। স্থানীয় বাজারে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কয়লার মূল্য ২০০ মা. ডলারের বেশি। পিডিবি কর্তৃক কয়লার আংশিক মূল্য পরিশোধ করায় বর্তমানে কয়লা উত্তোলন কার্যক্রম চলমান রাখতে তারল্য সংকটের কারণে বিসিএমসিএল কর্তৃপক্ষ হিমসিম খাচ্ছে। এই পেক্ষাপটে বিসিএমসিএল হতে বিপিডিবি-তে সরবরাহকৃত কয়লার মূল্য উত্তোলন ব্যয় অপেক্ষা কম হওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে আর্থিক সংকটে খনিটি প্রায় বন্ধ হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। উন্মুক্ত বাজারে বড়পুকুরিয়ার কয়লার প্রচুর চাহিদা থাকা সত্তে¡ও বাহিরে বিক্রয় করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অনেকের অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ডাস্ট কয়লা প্রতি টন ১২,২০২.০০ টাকা বাইরে বিক্রয় হচ্ছে। এবার ইট ভাটার মৌসুম শূরু হলেও বিসিএসিএল এর পরিচালনা পর্ষদ চেয়ারম্যানের সমন্বয়হীনতার কারণে ডাস্ট কয়লা (Sedimented coal) বিক্রয় করা সম্ভব হয়নি। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির পরিচালনা পর্ষদের ৭ জন সদস্যের মধ্যে পর্ষদ চেয়ারম্যানসহ বিদ্যুৎ বিভাগেরই ০৩ জন সদস্য। বড়পুকুরিয়াই একমাত্র কয়লা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, যার একমাত্র ক্রেতা পিডিবি কয়লা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে অর্থাৎ ক্রেতা তার ক্রয়কৃত মালামালের মূল্য নিজেই নির্ধারণ করেন। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী প্রত্যেক কোম্পানিকে প্রতি ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে একটি বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিসিএমসিএল-এর পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অন্য ২ জন পরিষদ সদস্যসহ মোট ৩ জন পিডিবির কর্মকর্তা হওয়ায় তাদের সমন্বহীয়তায় বিসিএমসিএল-এর বার্ষিক সাধারণ সভা ৩১ ডিসেম্বরের ২০২৫ এর মধ্যে করা সম্ভব হচ্ছে না। গত ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ১৫.৬৮ একর জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বাবদ ১১৩.৯৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কয়লা উত্তোলনের জন্য আরও ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এতে স্থাপনাসহ অধিগ্রহণ বাবদ প্রায় ১,২০০.০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বিগত ২০২১ থেকে ২৪ অর্থবছরে বিসিএমসিএল-এর টন প্রতি কয়লার প্রকৃত উত্তোলন ব্যয় যথাক্রমে ১৩৮, ১৩৩ ও ১৪০ মা.ডলার হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ ব্যয়সহ আগামী ৪ বছরে কয়লার গড় উত্তোলন ব্যয় হবে প্রায় ১৭৭ মা. ডলার। পিডিবির ন্যায় কয়লা খনিকে সরকার কোন ভর্তুকি দেয় না। কয়লা খনির লাভের বড় অংশ জমি অধিগ্রহণ বাবদ ব্যয় হয়। এছাড়াও কয়লার বিক্রয় মূল্যের ১১.৫০% রয়্যলটি সরকারকে দিতে হয়।
বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩টি ইউনিট মিলে মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট। তবে পিডিবি’র পক্ষে ৩টি ইউনিট কখনোই একসাথে চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বছরের বেশিরভাগ সময় কখনো ১টি-২টি বা ৩টি ইউনিটই একসাথে বন্ধ থাকে। পিডিবি’র সম্পূর্ণ সক্ষমতা ইউটিলাইজেশন এর অভাবে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কোল ইয়ার্ডে প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা অব্যবহৃত অবস্থায় মজুত রয়েছে। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য কেন্দ্রটির দৈনিক প্রায় ৫,২০০ মেট্রিক টন কয়লার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দৈনিক ২৫০০-৩০০০ মে. টন কয়লার বেশি পিডিবি সরবরাহ নিতে পারে নাই। বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩টি ইউনিটের ইক্যুইপমেন্ট নিম্নমানের আমদানি করার ফলে বছরের অধিকাংশ সময় ইউনিট ৩টি-তে যান্ত্রিক ত্রæটির কারণে কেন্দ্রের ৩টি ইউনিটের সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক পিডিবি ব্যবহার করতে পারে। বাকি অর্ধেক কোল ইয়ার্ডে মজুত থাকায় দিন দিন মজুতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে পিডিবি’র ৩টি ইউনিটের মধ্যে ১ টির মাধ্যমে সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ উৎপাদন চলমান থাকায় পিডিবি-এর ইফিসিয়েনসি নিয়ে ঊচ্চ পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। পিডিবি’র ইফিসিয়েনসি যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কয়লার মূল্য পুনঃনির্ধারণ, বকেয়া আদায়, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)সহ বিভিন্ন আর্থিক কর্মকান্ডের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ভূ-গর্ভ থেকে উত্তোলিত কয়লা বপুতাবিকে কর্তৃক সরাসরি গ্রহণের সময় ০১ এপ্রিল ২০১৯ থেকে ৩য় চুক্তির শেষ অবধি (২৯ ডিসেম্বর ২০২১) পর্যন্ত টোটাল ময়েশ্চার হতে ইনহ্যারান্ট ময়েশ্চার বাবদ ৫.১% বাদ দিয়ে সমন্বয় প্রক্রিয়া চলমান ছিল। ইনহ্যারেন্ট ময়েশ্চার ৫.১% বিবেচনায় উক্ত সময়ে ময়েশ্চার বাবদ ১,৫২,৬৩৮.৫৮৯ মেট্রিক টন উত্তোলিত কয়লা হতে সমন্বয় করা হয়েছে।
তৎপরবর্তীতে, চলমান চুক্তির শুরু থেকে অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর ২০২১ হতে ইনহ্যারান্ট ময়েশ্চার ৩.৩৯% বিবেচনায় নভেম্বর’২৫ মাস পর্যন্ত ২,২১,৭৬৫.৯৪ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলিত কয়লা হতে সমন্বয় করা হয়েছে। অর্থাৎ, ০১ এপ্রিল ২০১৯ থেকে নভেম্বর ২৫ মাস পর্যন্ত উত্তোলিত কয়লা হতে ময়েশ্চার বাবদ ৩,৭৪,৪০৪.৫৩ মেট্রিক টন সমন্বয় করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৬৪৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশে বিদ্যমান কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দের মধ্যে বাংলাদেশ-চীন পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (BCPCL)- ICI3 grade এর সমপর্যায়ের কয়লা; কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (CPGCBL)- ICI3 grade এর সমপর্যায়ের কয়লা; বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশীপ কোম্পানী লিমিটেড (BIFPCL) – ICI3 grade এর সমপর্যায়ের কয়লা এবং আর-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড (RNPL)- ICI3 grade এর সমপর্যায়ের আমদানিকৃত কয়লা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মোট তিনটি ইউনিট রয়েছে। ইউনিট-১ (প্লান্ট ক্যাপাসিটি-১২৫ মেগাওয়াট), ইউনিট-২ (প্লান্ট ক্যাপাসিটি-১২৫ মেগাওয়াট) এবং ইউনিট-৩ (প্লান্ট ক্যাপাসিটি-২৭৫ মেগাওয়াট) অর্থাৎ মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট। বর্তমানে ইউনিট-১ হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ইউনিট-১ ও ২, ২০০৫ সালে কমিশনিং সম্পন্ন হয়। সে সময় ইউনিট-১ এর ডিজাইন কার্যদক্ষতা ছিল ৪৩% (gross), ডিজাইন কার্যদক্ষতা বিবেচনায় বর্তমান বড়পুকুরিয়ার কয়লার মূল্য ১৭৬ মার্কিন ডলার (১ মার্কিন ডলার=১২২ ধরে) ডিজাইন কার্যদক্ষতা অনুসারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার খরচ ৬.৯০ টাকা এবং বর্তমান কার্যদক্ষতা অনুসারে ইউনিট-১ হতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার খরচ দাঁড়ায় আনুমানিক ১১.০০ টাকা। ইউনিট-৩ এর ডিজাইন কার্যদক্ষতা অনুসারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার খরচ দাঁড়ায় ৬.৮২ টাকা এবং বর্তমান কার্যদক্ষতা অনুসারে হতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার খরচ দাঁড়ায় আনুমানিক ৮.০০ টাকা। বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার বর্তমান অতিরিক্ত খরচের মূল্যের কারণ প্লান্টের ডিজাইন কার্যদক্ষতা হ্রাস পাওয়া। ইউনিট-১ এর ক্ষেত্রে কমিশনিং সময় হতে অদ্যবধি কার্যদক্ষতা (gross) হ্রাস পেয়েছে প্রায় (৪৩-২৮)=১৫%। অপরদিকে ইউনিট-৩ এর ক্ষেত্রে কমিশনিং সময় হতে অদ্যবধি কার্যদক্ষতা (gross) হ্রাস পেয়েছে প্রায় (৪৪-৩৬)=৮%। প্লান্টের ডিজাইন ও বর্তমান কার্যদক্ষতা এবং আমদানিকৃত কয়লার গুণগতমান বিশ্লেষণ হতে দেখা যায় আমদানিকৃত কয়লা দ্বারা পরিচালিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসমূহ তাদের প্লান্ট ডিজাইন অনুসারে আমদানিকৃত কয়লা দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। প্লান্টের কার্যদক্ষতার সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সরাসরি জড়িত। প্লান্টের কার্যদক্ষতা হ্রাস পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কয়লার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই নিম্নগামী কার্যদক্ষতা অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ভবিষতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ কয়লার মূল্য ও ডলার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলেও প্লান্টের কার্যদক্ষতা হ্রাস পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে দেশে অবস্থিত কয়লা ভিত্তিক কেন্দ্রগুলো হতে প্রাপ্ত তথ্য হতে দেখা যায় প্রতিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ডিজাইন ক্যালোরিফিক ভ্যালু বড়পুকুরিয়া হতে উত্তোলিত কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু হতে কম। বাংলাদেশের অন্যন্য কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে বড়পুকুরিয়ার কয়লা ব্যবহার করা যাবে কিনা তার জন্য একটি সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন বলে অনেকেই মনে করছেন। কয়লা আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রে দেখা যায়, আমদানিকৃত কয়লা দ্বারা পরিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রসমূহ কয়লার মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্লান্টের বেস/ডিজাইন প্যারামিটারের সাথে আমদানিকৃত কয়লার গুণগতমান বিবেচনায় নিয়ে কয়লার মূল্য সমন্বয় করে থাকে। অপরদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি হতে কয়লা সরবরাহের ক্ষেত্রে সেরকম কোন সমন্বয় পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় না। গত ২০০৫ সাল হতে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কয়লা উত্তোলন শুরু করলেও এই দীর্ঘ ২০ বছরে, আমদানি নির্ভর কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ন্যায় বড়পুকুরিয়ার কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালুর সাথে বড়পুকুরিয়ার তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ডিজাইন ক্যালোরিফিক ভ্যালুর কোন প্রকার সমন্বয় করা হয়নি। বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট-১ ও ২ এর ডিজাইন ক্যালোরিফিক ভ্যালু ৫,৮০০ কিলোক্যালোরি/কেজি এবং ইউনিট-৩ এর ৫,৬০০ কিলোক্যালোরি/কেজি। অপরদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু ৬,১৩৭ কিলোক্যালোরি/কেজি অর্থাৎ ডিজাইনের তুলনায় বড়পুকুরিয়ার কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু প্রায় ১.০৫২ গুণ ও ১.০৯৩ গুণ বেশি। বপুতাবিকে কয়লা গ্রহণ করার পর কয়লা সংরক্ষণের জন্য বিসিএমসিএল-এর কোল ইয়ার্ড ভাড়া ছাড়াই ব্যবহার করছে। কোল ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রযান সমূহের জ্বালানি, মেইনটেইন্সেস, স্পেয়ার পার্ট, গাড়ি চালকের বেতন, ভাতা, অধিকাল ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়সহ গাড়ি ভাড়া বাবদ বার্ষিক আনুমানিক ৬.৫০ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। অপরদিকে কোল ইয়ার্ডে নিরাপদে কয়লা সংরক্ষণের জন্য প্রতিনিয়ত পানি স্প্রে করার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত পাম্প, পাইপ লাইন নেটওয়ার্ক, ফায়ার ফাইটিং পাইপ, ফায়ার ফাইটিং কার, নিয়োজিত জনবলের বেতন ভাতা ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ বার্ষিক ২০ লক্ষ টাকার প্রয়োজন হয়। এছাড়া, সাইলো ও রিক্লেইম বেল্ট মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, স্পেয়ার পার্ট ক্রয়, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ বার্ষিক আনুমানিক ৫০ লক্ষ টাকার প্রয়োজন হয়। বপুতাবিকে কর্তৃক কোল ইয়ার্ড ব্যবহারের ফলে কোল ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় বার্ষিক আনুমানিক ৭.২ কোটি টাকার প্রয়োজন হয় যা কোম্পানির নিজস্ব তহবিল হতে নির্বাহ করা হয় বলে জানা যায়। কয়লা খনি বৈদেশিক ঠিকাদারকে প্রায় ৬৮% অর্থ মার্কিন ডলারে পরিশোধ করে থাকে, অবশিষ্ট ৩২% স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়। কিন্তু আমদানি করা কয়লার ক্ষেত্রে সমুদয় অর্থাৎ ১০০% অর্থই মার্কিন ডলারে পরিশোধ করতে হয়। তাই দেশীয় কয়লা ব্যবহার করলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা (মার্কিন ডলার) সাশ্রয় সম্ভব। বিসিএমসিএল-এর উত্তোলিত কয়লার উপর ভ্যাট, ট্যাক্স, রয়ালটি ইত্যাদি বিবিধ খাতে সরকারি কোষাগারে প্রায় ৩৯% রাজস্ব জমা হয়; অপরদিকে আমদানিকৃত কয়লার ক্ষেত্রে ২৫% সিডি ভ্যাট সরকার পেয়ে থাকে। বিশ্বের যে কোন খনি উন্নয়নের লক্ষে প্রথমেই অনুসন্ধান ও সমীক্ষা ব্যয় একটি প্রাথমিক ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। কয়লা খনিও তার ব্যতিক্রম নয়। সে লক্ষে ভূতাত্বিক তথ্য সংগ্রহ, নমুনা পরীক্ষা, মানচিত্র তৈরি, ড্রিলিং, ভূ-ভৌত ও ভূ-রাসায়নিক সমীক্ষা এ সকল কাজের জন্য বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে অনুসন্ধান ও সমীক্ষা ব্যয় বাবদ বড়পুকুরিয়ার নিজস্ব তহবিল হতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। গ্যাস ক্ষেত্রগুলো উন্ননের জন্য বাংলাদেশ গ্যাস উন্নয়ন তহবিল রয়েছে, যা থেকে গ্যাস সেক্টর উন্নয়নের জন্য অনুসন্ধান ও সমীক্ষা ব্যয় নির্বাহ করা হয় কিন্তু বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে এ ধরণের কোন তহবিলের সংস্থান না থাকায় অনুসন্ধান ও সমীক্ষা ব্যয় বাবদ অর্থ কয়লা খনি তার নিজস্ব তহবিল হতে ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। ফলে অনুসন্ধান ও সমীক্ষা ব্যয় বাবদ কোম্পানিটির নিজস্ব তহবিল হতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।
সুত্র জানা যায়, বিসিএমসিএল একটি জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হলেও অন্যান্য সাধারণ গ্রাহকের ন্যায় বাণিজ্যিক রেইটে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করে আসছে। এক্ষেত্রে তারা বিসিএমসিএল-কে কোন ছাড় দেয় না। অথচ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের দোহাই দিয়ে পিডিবি বাইরে কয়লা বিক্রয় করতে দিতে চায় না এবং বাজার মূল্য থেকে কম মূল্যে কয়লার বিল পরিশোধ করতে চাচ্ছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ভূ-গর্ভ থেকে উত্তোলিত পানির অধিকাংশই পিডিবি তাদের কুলিং টাওয়ারে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহার করছে। অপরদিকে পিডিবি কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে বিসিএমসিএল কোল এ্যাশ কিনে ভূ-গর্ভে নিরাপত্তার কজে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ১০০ টাকা মুনাফা হলে ৫ টাকা কর্মচারীরা পায়। তবে পেট্টোবাংলার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ন্যায় কয়লা খনিতে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল নেই, যেখানে পিডিবি’র প্রতিষ্ঠাগুলোতে স্বতন্ত্র বেতন স্কেলে-এ বেতন সরকারী বেতন স্কেল অপেক্ষা আড়াই গুন বেশী বেতন-ভাতাদি নিচ্ছে আবার প্রফিট বোনাসও নিচ্ছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী মুনাফার ৫% অর্থই কর্মচারিরা পেয়ে থাকেন।
২০১৯ সাল থেকে পিডিবি ব্যতীত অন্যান্য ক্রেতা সাধারণের নিকট কয়লা বিক্রয় বন্ধ রয়েছে। ২০১৯ সালে স্থানীয় ক্রেতার নিকট বিসিএমসিএল এর কয়লার মূল্য ছিলো ২০২ মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০২২ সাল পর্যন্ত বিসিএমসিএল ১৩০ মার্কিন ডলার মূল্যে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ করে। ফলে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিসিএমসিএল প্রতি মেট্রিক টনে (২০২-১৩০) বা ৭২ মা. ডলার করে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জানুয়ারি ২০২২ সাল থেকে বিপিডিবি’র নিকট সরবরাহকৃত কয়লার মূল্য ১৭৬ মার্কিন ডলার হলেও স্থানীয় ক্রেতাদের নিকট ২০২ মার্কিন ডলার করে বিক্রয় করা যেতো বলে ধারণা করা যায়। এক্ষেত্রেও বিসিএমসিএল প্রতি মেট্রিক টনে (২০২-১৭৬) বা ২৬ মার্কিন ডলার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়লার মূল্য কম পাবার কারণে সরকার ভ্যাট, ট্যাক্স, রয়্যালটি প্রভৃতি খাত হতে বিপুল রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ বিপিডিবি প্রতি বছর সরকার থেকে প্রায় ৩৫,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি নিচ্ছে। কোল ইয়ার্ডের কয়লা মজুত নিরাপদ মজুত উচ্চতার চেয়ে অনেক বেশী। স্বাভাবিকভাবে কয়লার মজুত ৫-৭ ফুট উচ্চতায় রাখা হয়। কিন্তু পিডিবি কয়লা ব্যবহার করতে পারছে না। এই ব্যর্থতা ঢাকার অন্য কয়লার দাম কমিয়ে তারা খনিটি বন্ধের অপচেষ্টা করছে। বেশি কয়লা সংরক্ষণ করার ফলে যেকোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা করে পিডিবিকে কয়লা খনি একাধিক পত্র প্রেরণ করেছে। কিন্তু পিডিবি এ বিষয়ে কোন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করার ফলে ২৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে কোল ইয়ার্ডের বাউন্ডারী ওয়াল ভেঙ্গে পড়ে। এতে কয়লা লুটপাটের আশংকাসহ কোম্পানির নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। কয়লা খনি বন্ধ হলে পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবে। ফলে খনিটির সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২০-২৫ হাজার পরিবার তাদের জীবিকা হারানোসহ আর্থিকভাবে সংকটে পড়বে।
বড়পুকুরিয়া খনিটি বন্ধ করে বিদেশ থেকে অধিক মুল্যে কয়লা আমদানি করে বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য একটি কুচক্রি মহল দীর্ঘদিন ধরে অপচেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। কয়লার দাম নিয়ে খনির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। কয়লার মূল্য যাতে কমানো না হয়, সেটি তুলে ধরে সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী মহলে যোগাযোগ করছে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক ইউনিয়ন। খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ছাড়া আরও অনেক হিসাব রয়েছে যেসব বিবেচনায় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির কয়লার দাম কমানো যুক্তিযুক্ত হবে না। কয়লার দাম কমানো হলে খনিটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
