করাপশন টক
শুক্রবার, ২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাষ্ট্রের কাগজে বৈধ, বাস্তবে মানবপাচার! সার্বিয়া হয়ে ইউরোপে কীভাবে গড়ে উঠেছে নতুন ট্রাফিকিং রুট?

editor
জানুয়ারি ২৩, ২০২৬ ৫:৫৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আজ ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় কাতার এয়ারওয়েজের (QR640) ফ্লাইটে পাচারের শিকার ইতি আক্তার, রাসেল ও জিহান নিরাপদে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু তাদের মত অন্যরাও কি ফিরতে পারবেন নিজ জন্মভূমিতে?

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কাজের স্বপ্ন দেখানো এবং সেই স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে বিষয়টি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, তা হলো সার্বিয়া হয়ে ইউরোপের শেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে মানবপাচারের একটি নতুন, সংগঠিত ও দ্রুত বিস্তৃত রুটের উত্থান। এই রুট কোনো রাষ্ট্রবহির্ভূত বা অবৈধ কাঠামোর বাইরে তৈরি হয়নি; বরং রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকেই কৌশলে ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে। এখানে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি এবং আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র পরস্পরের পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

কাগজে-কলমে সবকিছু বৈধ। কিন্তু বাস্তবে এই রুটের প্রতিটি ধাপেই মানবপাচারের স্পষ্ট ও নির্দয় আলামত বিদ্যমান।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) এর ছাড়পত্রের মূল উদ্দেশ্য নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও মর্যাদাসম্পন্ন শ্রম অভিবাসন নিশ্চিত করা। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি এই ছাড়পত্রকেই মানবপাচারের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। কর্মীদের পাঠানো হচ্ছে তথাকথিত “স্ব-দায়িত্ব (self-responsibility)” ভিসায়, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে রিক্রুটিং এজেন্সির নাম বা লাইসেন্স নম্বর (RL) ব্যবহার করা হয় না। কাগজে কর্মীরা নিজের দায়িত্বে বিদেশে যাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে তাদের যাত্রাপথ, গন্তব্য, অবস্থান এবং প্রতিশ্রুত চাকরি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে মানবপাচারকারী চক্র।

এর ফলশ্রুতিতে কোনো নির্যাতন, শোষণ বা বিপর্যয় ঘটলে দায়বদ্ধতা হারিয়ে যায় আইনি শূন্যতায়, আর ভিকটিমরা পড়ে যায় চরম অসহায়ত্বে। এটি কেবল কিছু অপরাধীর বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম নয়; এটি একটি গভীর, কাঠামোগত রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এই ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিদেশে পৌঁছানোর পর। একজন কর্মী নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন কি না, নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন কি না, চুক্তি অনুযায়ী বাসস্থান, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন কি না, নাকি তিনি জিম্মি, শোষণ কিংবা দ্বিতীয় ধাপের পাচারের শিকার হয়েছেন এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর নজরদারি কার দায়িত্ব?

নীতিমালা অনুযায়ী এই দায়িত্ব BMET–এর। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো, ২০২৫ সালে সার্বিয়ায় পাঠানো সাড়ে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মীর জন্য কি BMET-এর কাছে কোনো নিয়মিত পোস্ট-মাইগ্রেশন মনিটরিং রিপোর্ট রয়েছে? কোন কর্মী কোথায় আছেন, কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, এই তথ্য কি আদৌ সংরক্ষিত? এই তথ্যগত শূন্যতাই মানবপাচারকারীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

এই ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার মানবিক মূল্য সবচেয়ে নির্মমভাবে ফুটে ওঠে ইতি আক্তার, রাসেল ও জিহানের ঘটনায়। বৈধ চাকরির আশায় তারা একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সার্বিয়া যান। প্রত্যেকে প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। চলতি বছরের ৭ জুলাই তাদেরসহ মোট ২০ জন বাংলাদেশিকে সার্বিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু বেলগ্রেড বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরই তাদের স্বপ্ন ভেঙে পড়ে।

সার্বিয়ায় অবস্থানরত ওই রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের ছোট ভাই একজন বাংলাদেশি নাগরিক তাদের রিসিভ করে একটি নিয়ন্ত্রিত হোস্টেলে নিয়ে যায়। সেখানে কেড়ে নেওয়া হয় চলাচলের স্বাধীনতা, যোগাযোগের সুযোগ এবং নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। তারা কার্যত পরিণত হন জিম্মিতে।

পরবর্তীতে মানবপাচার চক্র আরও সক্রিয় হয়। মানিকগঞ্জের শফিকুল ইসলামসহ ১৮ জনকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে অবৈধ স্থলপথে ইতালিতে পাচার করা হয়। শফিকুল ইসলামের করুণ বাস্তবতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়েচেভেলে (DW)-এর প্রতিবেদনে উঠে আসে, যেখানে দেখা যায় তিনি বর্তমানে ইতালির একটি পার্কে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কিন্তু ইতি আক্তার, রাসেল ও জিহানকে ইতালিতে পাঠানো হয়নি। তাদের প্রায় চার মাস সার্বিয়ায় জিম্মি করে রাখা হয়। খাবার ছিল অনিয়মিত, চিকিৎসা ছিল অনুপস্থিত, আর নিরাপত্তা ছিল প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে। একপর্যায়ে প্রাণনাশের আশঙ্কায় তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং এক ভারতীয় নাগরিকের কাছে সাময়িক আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তারা জানান, টানা তিন দিন তারা কোনো খাবার পাননি।

এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে একটি নির্মম বাস্তবতা সার্বিয়ায় বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস বা কনস্যুলেট নেই। ফলে এই নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত ছিলেন। যে রাষ্ট্র তাদের যাত্রাকে কাগজে “বৈধ” হিসেবে অনুমোদন দিয়েছিল, সংকটের মুহূর্তে সেই রাষ্ট্র ছিল কার্যত অনুপস্থিত।

এই শূন্যতায় আশার আলো হয়ে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক সিভিল সোসাইটি সহযোগিতা। সার্বিয়াভিত্তিক মানবপাচারবিরোধী সংস্থা এনজিও এটিনা (ATINA)–এর সঙ্গে ব্র্যাকের যৌথ সমন্বয় ও নেতৃত্বে এই তিনজনের জীবন রক্ষার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এটিনা সার্বিয়ায় মানবপাচার ভিকটিম সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এবং সেইফ হোম ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। অন্যদিকে ব্র্যাক ভিকটিম শনাক্তকরণ, কেস ম্যানেজমেন্ট, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নেতৃত্ব দেয়।

যাচাই ও প্রাথমিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের পর কোনো বিলম্ব না করে একই দিনে জরুরি খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়, সার্বিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় শুরু হয় এবং এটিনার মাধ্যমে ভিকটিমদের একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। একই সঙ্গে ব্র্যাক ও এটিনার যৌথ উদ্যোগে আইনি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়, যেখানে ভিকটিমদের সম্মতি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়।

এই সমন্বিত ও মানবিক নেতৃত্বের ফলেই আজ ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ইতি আক্তার, রাসেল ও জিহান নিরাপদে দেশে ফিরেছেন। এটি প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যর্থ হলেও কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সিভিল সোসাইটির নেতৃত্ব মানবপাচারের মতো জটিল অপরাধের বিরুদ্ধে বাস্তব ফলাফল আনতে পারে। ইতি আক্তার পারিবারিক প্রতিবন্ধকতার কারনে পরিবারের ফিরতে না পারায় তার নিরাপদ আবাসনের জন্য নেওয়া হয় ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে।

তবে এই প্রত্যাবাসন কোনো সমাপ্তি নয়; এটি বরং আরও কঠিন প্রশ্নের সূচনা। রাশেল, জিহান ও ইতি আক্তার আজ নিরাপদ। কিন্তু শফিকুল ইসলাম এখনো ইউরোপের রাস্তায়। আরও কতজন বাংলাদেশি এই সার্বিয়া-কেন্দ্রিক পাচার রুটে আটকে আছেন, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকাই রাষ্ট্রের হাতে নেই।

BMET-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সার্বিয়ায় গেছেন ৫৪৭ জন বাংলাদেশি, আর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,৫১১ জনে। এই হঠাৎ ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক শ্রম অভিবাসনের ইঙ্গিত দেয় না; বরং এটি একটি সংগঠিত মানবপাচার রুটের বিস্তারের স্পষ্ট সংকেত।

এই বাস্তবতায় নীরবতা মানেই অপরাধের অংশীদার হওয়া। প্রশ্ন এখন একটাই যারা এখনো ফিরতে পারছেন না, তাদের জন্য রাষ্ট্রের পরিকল্পনা কী? রাষ্ট্র কি কেবল কাগজে বৈধতা দেবে, নাকি বাস্তব সুরক্ষার দায়িত্বও নেবে?

এই গল্প কেবল কয়েকজন ভিকটিমের নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আয়না।
প্রশ্ন একটাই পরবর্তী ভিকটিম কে?
আর তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব কি রাষ্ট্র সত্যিই নেবে, নাকি আবারও দায় এড়িয়ে যাবে?

আল আমিন নয়ন,
অভিবাসী অধিকার কর্মী।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।